ঢাকাশনিবার , ১৬ মে ২০২০
আজকের সর্বশেষ সবখবর

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপাচার্যের বিদায়

Tito
মে ১৬, ২০২০ ১০:০২ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

ড. গোলাম শাহি আলম।।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহে পড়াকালীন সময়ে ক্যাম্পাস জীবনের পেছনে ফেলে আসা দিনগুলোর মধ্যে স্মৃতির পাতা থেকে বরেণ্য শিক্ষাগুরু, জ্ঞান তাপস, সর্বজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক, মাননীয় ভি,সি স্যার প্রফেসর ডঃ মছলেহ উদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী স্যার এর বিদায় সম্বধর্নাটির কথা মনে পড়ে গেল। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এত বড় বর্ণাঢ্যময় বিদায় সম্বধর্না আমার চোখে আর পড়েনি। আশির দশকে আমরা যারা বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম তখন ঐ সময় আমাদের মাননীয় উপাচার্য ছিলেন পশু চিকিৎসা অনুষদের অনুজীব বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. মছলেহ উদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী। একজন সফল বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী ছিলেন স্যার।
স্যার আমাদের সরাসরি শিক্ষক ছিলেন না। কিন্তু এই অনিন্দ্য সুন্দর এবং জ্যোতির্ময় মানুষ টিকে দেখলেই আপনা আপনি অবনত মস্তকে শ্রদ্ধা জানাতে বিন্দুমাত্র কোন কার্পণ্য বোধ হতো না। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ১৯৭৩ সাল থেকে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে স্যার এর যাত্রা শুরু আর এর সফল পরিসমাপ্তি ঘটে ১৯৮১ সালে। আশির জানুয়ারির মর্মান্তিক এবং বেদনা দায়ক ছাত্র হত্যা সংক্রান্ত দুঃখজনক পর্বটির কথা বাদ দিলে স্যার এর কর্ম কাল ছিল জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চার শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ আর উন্নয়ন ধারার স্বর্ণযুগ। তাই বলা হয়ে থাকে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্যার ছড়িয়েছেন জ্ঞানের আলো। রেখে গেছেন এক অনিন্দ্য সুন্দর দ্যুতিময় ক্যাম্পাস।
আমরা ছাত্র থাকাকালীন সময়ে স্যার কে ভি,সি হিসেবে বেশী দিন পাইনি কিন্তু যেটুকু সময় স্যারকে পেয়েছি তাতে দেখেছি স্যার তাঁর সক্রিয় কর্মতৎপরতা এবং সুদীর্ঘকালের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে গতিশীল ও যাদুকরী নেতৃত্ব দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসটি কে একটি অনন্য সুন্দর ক্যাম্পাস গড়ে তুলতে পেরেছিলেন। এখন বিশ্ববিদ্যালয় এর জৌলুস হয়ত অনেক বেশী কিন্তু ঐ সময়েই কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্য ছিল চোখে পড়ার মতো। বলতে গেলে ঐ সময়ে সুসজ্জিত এবং নয়নাভিরাম সৌন্দর্য মন্ডিত ক্যাম্পাস ছিল দেখার মতো। এক বিষ্ময়কর মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। ঈর্ষণীয় সাফল্য আর উন্নয়ন এর অগ্রযাত্রার শুভ সূচনা হয়েছিল স্যার হাত ধরেই।
মছলেহ উদ্দীন স্যার ছিলেন দল মত নির্বিশেষে সর্বজন শ্রদ্ধেয় এবং তাঁর অগাধ ভালবাসায় আপামর ছাত্র শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীরা সবাই ধন্য। এত সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলোকিত মানুষ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আর ভি, সি হিসেবে পাবে কিনা আমি জানি না।
উপাচার্য স্যার যে কি পরিমান জনপ্রিয় এবং শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন তাঁর বিদায় সম্বর্ধনা টিই ছিল তার বড় প্রমাণ। মাননীয় উপাচার্য স্যার এর বিদায় বেলায় সকল স্তরের মানুষের যে ঢল নেমেছিল ঐ সময় যাঁরা দেখেছেন/ছিলেন তাঁরাই কেবল বলতে পারবেন। আমার জীবনে এত বড় ছাত্র-শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী সমন্বয়ে আবেগঘন বিদায় অনুষ্ঠান এখনও দেখিনি। একজন শিক্ষক বা উপাচার্যের বিদায় বেলায় এতো মানুষের ঢল হতে পারে তা ছিল আমার কল্পনার অতীত। স্যার এর বিদায় মিছিলটি ছিল যেন শত শত মানুষ এর অপরিসীম শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার কয়েক কিলোমিটার এর কাফেলা। বিদায় সম্বধর্নার তারিখ টি এখন আর স্মৃতির পাতা থেকে মনে করতে পারছি না। অনেকেরই হয়ত মনে থাকতে পারে। শ্রদ্ধেয় রাজ্জাক স্যার বা সাইদুল হক চৌধুরী স্যার বা প্রদীপ দা হয়ত তারিখটির কথা বলতে পারবেন বা অন্য কেউ। কারন ঐ দিন স্যার এর বিদায় সম্বধর্না টির আয়োজনে সম্মুখ সারিতে ছিলেন তৎকালীন শিক্ষক সমিতি, বাকসু সহ অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারী। তবে স্পষ্ট মনে আছে ঐদিন বিদায় জানাতে উপস্থিত মানুষের শ্রদ্ধা আর অশ্রুসিক্ত নয়নের ভালোবাসায় অভিসিক্ত হয়েছিলেন উপাচার্য স্যার। বিদায় বেলায় ঐদিন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে ছাত্র শিক্ষক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর শৃঙ্খলা বদ্ধ লাইন পড়েছিল যার সম্মুখভাগ ছিল ময়মনসিংহ শহরের কাছাকাছি কেওয়াটখালি রেলগেইট আর পশ্চাৎভাগ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেন এর কাছে। এই বিদায় বেলার সফল সমাপ্তি ঘটে স্যার কে ময়মনসিংহ রেলওয়ে ষ্টেশনে ট্রেনে উঠিয়ে দেয়ার মাধ্যমে।
এই স্মৃতি এখনও হৃদয়ের গহীন কোনে জ্বল জ্বল করছে এবং অম্লান হয়ে থাকবে অনন্তকাল। স্মৃতিতে চির ভাস্বর হয়ে থাকবে। এই দেবতা তুল্য মানুষটিকে একটু পা ছুঁয়ে দোয়া বা আশীর্বাদ নেয়ার জন্য আবাল বৃদ্ধ বনিতা হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল।
এখনও মনে পড়ে ময়মনসিংহ রেল স্টেশনের সেই কৃষ্ণ চূড়া গাছের নীচে বিদায়ের শেষ বেলার স্মৃতি টুকু। শিক্ষক সমিতির পক্ষে ডঃ সাইদুল হক চৌধুরী স্যার, বাকসুর পক্ষে মান্নান ভাই ও প্রদীপ দার আবেগময় বক্তৃতা। কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে বিদায় সম্বর্ধনার সেই সমাপনী বক্তব্য এখনও কানে বাজে। এখানে উল্লেখ করতে হয় সাইদুল হক চৌধুরী স্যার তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সম্মানিত সাধারণ সম্পাদক। আশির দশকে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই সুদর্শন স্যার ছিলেন ভীষণ জনপ্রিয় এবং পরিচিত নাম। ছাত্র শিক্ষক কর্মকর্তা আর কর্মচারী সবার সাথেই স্যার এর সমান সু সম্পর্ক। স্যার এই মহৎ গুনে খুব সহজেই সবাইকে একই মঞ্চে আনতে পেরেছিলেন এবং শিক্ষক সমিতির পক্ষে সাইদুল হক স্যার ঐ বিদায় অনুষ্ঠানটি তাঁর দক্ষতা আর নিজস্ব গুণাবলী দিয়ে অত্যন্ত সুন্দর ও সুচারুভাবে সুসম্পন্ন করেছিলেন। আর এটা সম্ভব হয়েছিল বাকসু নেতৃবৃন্দ সহ সকল শিক্ষক, কর্মকর্তা,
কর্মচারী আর সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে সুন্দর সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে। এখানেই নেতৃত্বের সার্থকতা।
আমার মনে হয় সাইদুল হক স্যার সহ সংশ্লিষ্ট সকলের জীবনে এই বিদায় সম্বধর্না অনুষ্ঠানটি একটি বড় স্মৃতি হয়ে আছে এবং থাকবে।
জ্ঞানতাপস উপাচার্য, অধ্যাপক ডঃ মছলেহ উদ্দিন স্যার এখন পরপারে। তবুও স্মৃতির ভেলাতে চড়ে বলি স্যার, আপনি যেখানেই থাকুন ভালো থাকুন, সুন্দর থাকুন। পরপারে অনেক শান্তি তে থাকুন। পরিশেষে, স্যার এর প্রয়াত বিদেহী আত্মার চির শান্তি ও স্বর্গলোক কামনা করছি।

লেখক :
প্রফেসর অব থেরিওজেনোলোজি,
সদস্য, বাংলাদেশ এক্রিডিটেশন কাউন্সিল, ঢাকা
ডিপার্টমেন্ট অব সার্জারী এন্ড অবস্টেট্রিকস, ভেটেনারি সাইন্স ফ্যাকাল্টি, বাংলাদেশ এগ্রিকালাচারাল ইউনিভার্সিটি, ময়মনসিংহ
সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর, সিলেট এগ্রিকালচারাল ইউনিভারসিটি, সিলেট।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।